হযরত খিজির (আঃ) যে জনপদে পৌছেন এবং যার অধিবাসীরা তার আতিথেয়তা করতে অস্বীকার করে, হযরত ইবনে আব্বাসের রেওয়াতে সেটাকে এন্তেকিয়া ও ইবনে সীরিনের রেওয়ায়েতে ‘আইকা’ বলা হয়েছে।হযরত আবু হোরায়রা রাঃ থেকে বর্ণিত আছে যে,সেটি ছিল আন্দালুসের একটি জনপদ।-(মাযহারী) কাব আহযাব থেকে বর্ণিত রয়েছে যে এই নৌকাটি যে দরিদ্রদের ছিল, তারা ছিল দশ ভাই।তন্মধ্যে পাঁচ জন ছিল বিকলাঙ্গ।অবশিষ্ট পাঁচ ভাই মেহনত- মজুরী করে সবার জীবিকার ব্যবস্থা করত। নদীতে নৌকা চালিয়ে ভাড়া উপার্জন করাই ছিল তাদের মজুরি।
মিসকীনের সংঙ্গাঃ কারও কারও মতে মিসকীন এমন এক ব্যক্তি,যার কাছে কিছুই নেই।কিন্তু আলোচ্য আয়াত থেকে মিসকীনের সঠিক সংঙ্গা এই জানা যায় যে,অত্যাবশ্যকীয় অভাব পূরণ করার পর যার কাছে নেসাব পরিমাণ মালও অবশিষ্ট থাকে না,সে-ও মিসকিনের অন্তর্ভুক্ত।কেননা আয়াতে যাদেরকে মিসকীন বলা হয়েছে,তাদের কাছে কমপক্ষে একটি নৌকাটি অত্যাবশ্যকীয় প্রয়োজনাদী পূরণে নিয়োজিত ছিল।তাই তাদেরকে মিসকীন বলা হয়েছে।- (মাযহারী) বগভী হযরত ইবনে আব্বাস থেকে বর্ণনা করেন যে,নৌকাটি যেদিকে যাচ্ছিল,সেখানে একজন জালেম বাদশাহ এই পথে চলাচলকারী সব নৌকা ছিনিয়ে নিত।হযরত খিযির এ কারনে নৌকার একটি তক্তা উপরে দেন,যাতে জালেম বাদশাহর লোকেরা ভাঙ্গা দেখে নৌকাটি ছেড়ে দেয় এবং দরিদ্ররা বিপদের হাত থেকে বেঁচে যায়। হযরত খিযির (আঃ) যে বালকটি হত্যা করেন,তার স্বরুপ এই বর্ণনা করেছেন যে, তার প্রকৃতিতে কূফর ও পিতা-মাতার অবাধ্যতা নিহিত ছিল। তার পিতা-মাতা ছিল সৎকর্মপরায়ণ পিতা-মাতাকে বিব্রত করবে এবং কষ্ট দেবে। সে কুফরে লিপ্ত হয়ে পিতা-মাতার জন্যে ফেৎনা হয়ে দাঁড়াবে এবং তার ভালবাসায় পিতা-মাতার ঈমানও বিপন্ন হয়ে পড়বে। এজন্য আমি ইচ্ছা করলাম যে,আল্লাহ তায়ালা এই সৎকর্মপরায়ণ পিতা-মাতাকে এ ছেলের পরিবর্তে তার চাইতে উওম সন্তান দান করুক,যার কাজকর্ম ও চরিএ হবে পবিএ এবং সে পিতা-মাতার হকও পূর্ণ করবে। ইবনে আবী শায়বা,ইবনে মুনযীর ও ইবনে আবী হাতেম আতিয়্যার বাচনিক বর্ণনা করেন যে,নিহত ছেলের পিতা-মাতাকে আল্লাহ তাআলা তার পরিবর্তে একটি কন্যা দান করেন,পরিবর্তেকালে যার গর্ভে দু’জন নবী জন্মগ্রহন করেন।কোন কোন রেওয়ায়েতে রয়েছে যে,তার গর্ভ থেকে জন্মগ্রহনকারী নবীর মাধ্যমে আল্লাহ তাআলা একটি বিরাট উম্মতকে হেদায়েত দান করেন। হযরত আবু দারদা রাসুল (সাঃ) থেকে বর্ণনা করেন যে,প্রাচিরের নিচে রক্ষিত এতীম বালকদের গুপ্তধন ছিল স্বর্ণ-রৌপ্যের ভান্ডার।-(তিরমিযি হাকিম) হযরত ইবনে আব্বাস (রাঃ) বলেন সেটি ছিল স্বর্ণের একটি ফলক।তাতে নিম্নলিখিত উপদেশবাক্যসমুহ লিখিত ছিল।হযরত ওসমান ইবনে আফফান (রাঃ) ও এই রেওয়ায়েতটি রসুলুল্লাহ (সাঃ) থেকে বর্ণনা করেছেন।-(কুরতুবি) খিজির আঃ এর ঘটনা
(১)বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম। ২)সে ব্যক্তির ব্যাপারটি আশ্চর্যজনক,যে তকদীরে বিশ্বাস করে অথবা দুশ্চিন্তাগ্রস্থ হয়। (৩)সে ব্যক্তির ব্যাপারটি আশ্চর্যজনক যে আল্লাহ তাআলাকে রিযিকদাতারুপে বিশ্বাস করেেএরুপ প্রয়োজনাতিরিক্ত পরিশ্রম ও অনর্থক চেষ্টায় আত্মনিয়োগ করে। (৪) সে ব্যক্তির ব্যাপারটি আশ্চর্যজনক ,যে মৃত্যুতে বিশ্বাস রাখে,অথচ আনন্দিত ও প্রফুল্ল থাকে। (৫) সে ব্যক্তির ব্যাপারটি আশ্চর্যজনক যে পরকালের হিসাব নিকাশে বিশ্বাস রাখে,অথচ সৎকাজে গাফেল হয়। ৬)সে ব্যক্তির ব্যাপারটি আশ্চর্যজনক,যে দুনিয়ার নিত্যনৈমিওিক পরিবর্তন জেনেও নিশ্চিন্ত হয়ে বসে থাকে। ৭)লা ইলাহা ইল্লালাহু মুহাম্মদুর রসুলুল্লাহ।
পিতা-মাতার সৎকর্মের উপকার সন্তান-সন্ততিরাও পায়ঃ হযরত খিযির (আঃ) এর মাধ্যমে এতীম বালকদের জন্যে রক্ষিত গুপ্তধনের হেফাযত এজন্যে করানো হয় যে তাদের পিতা একজন সৎকর্মপরায়ণ আল্লাহর প্রিয় বান্দা ছিলেন।তাই আল্লাহ তায়ালা তার সন্তান-সন্ততির উপকারার্থে এ ব্যবস্থা করেন।মুহাম্মদ ইবনে মুনকাদির বলেনঃ আল্লাহ তায়ালা এক বান্দার সৎকর্মপরায়ণতার কারনে তার পরবর্তি সন্তান-সন্ততি বংশধর ও প্রতিবেশিদের হেফাযত করেন।-(মাযহারী) হযরত শিবলী (রহঃ) বলতেনঃ আমি এই শহর এবং সমগ্র এলাকার জন্যে শান্তির কারণ।তার ওফাতের পর তার দাফন সমাপ্ত হওয়ার সাথে সাথে দায়লামের কাফেররা দাজলা নদী অতিক্রম করে বাগদাদ নগরী অধিকার করে।তখন সবাই বলাবলি করতে থাকে যে,আমাদের উপর দ্বিগুণ বিপদ চেয়েছে,অর্থাৎ শিবলীর ওফাত ও কাফেরদের হাতে বাগদাদের পতন-(কুরতুবি) তফসীরে মাযহারীতে বলা হয়েছে,আয়াতে এদিকেও ইঙ্গিত হয়েছে যে,আলেম ও সৎকর্মপরায়ণদের সন্তান-সন্ততিদের খাতির করা এবং তাদের প্রতি স্নেহপরায়ণ হওয়া উচিত,যে পর্যন্ত না তারা পুরোপুরি পাপাচারে লিপ্ত হয়ে পড়ে। হযরত খিযির (আঃ) জীবিত আছেন,না ওফাত হয়ে গেছেঃ হযরত খিযির (আঃ) জীবিত আছেন,না তার ওফাত হয়ে গেছে।এ বিষয়ের সাথে কোরআন ও হাদীসে স্পষ্টতঃএ সম্পর্কে কিছু উল্লেখ করা হয়নি।কোন কোন রেওয়ায়েতে ও উক্তি থেকে তার অদ্যাবধি জীবিত থাকার কথা জানা যায়।ফলে এ ব্যাপারে সর্বকালেই আলেমদের বিভিন্নরুপ মতামত পরিদৃষ্ট হয়েছে।যাদের মতে তিনি জীবিত আছেন,তাদের প্রমাণ হচ্ছে মুস্তাদরাক হাকিম কর্তৃক হযরত আনাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত একটি রেওয়ায়েত।তাতে বলা হয়েছে যখন রাসুল (সাঃ) এর ওফাত হয়ে যায়,তখন সাদা কালো দাড়িওয়ালা জনৈক ব্যক্তি আগমন করে এবং ভিড় ঠেলে ভেতরে প্রবেশ করে কান্নাকাটি করতে থাকে। এই আগন্তুক সাহাবায়ে কেরামের দিকে মুখ করে বলতে থাকে।আল্লাহর দরবারেই প্রত্যেক বিপদ থেকে সবর আছে, প্রত্যেক বিলুপ্ত বিষয়ের প্রতিদান আছে বরং তিনি প্রত্যেক ধ্বংশসীল বস্তুর স্থলাভিষিক্ত।তাই তার দিকেই প্রত্যাবর্তন কর এবং তার কাছেই আগ্রহ প্রকাশ কর।কেননা , যে ব্যক্তি বিপদের সওয়াব থেকে বঞ্চিত হয়, সে-ই প্রকৃত বঞ্চিত। আগন্তুক উপরোক্ত বাক্যে বলে বিদায় হয়ে গেলে হযরত আবু বকর (রাঃ) ও আলী (রাঃ) বললেনঃইনি হযরত খিযির (আঃ)। মুসলিম শরীফের এক হাদীসে আছে যে,দাজ্জাল মদীনার নিকটবর্তি এক জায়গায় পৌছালে মদীনা থেকে এক ব্যক্তি তার মোকাবেলার জন্যে বের হবেন ।তিনি তৎকালিন লোকদের মধ্যে শ্রেষ্ঠতম হবেন কিংবা শ্রেষ্ঠতম হবেন কিংবা শ্রেষ্ঠতম লোকদের অন্যতম হবেন।আবু ইসহাক বলেনঃ এ ব্যক্তি হবেন হযরত খিযির (আঃ)। মুসলিম শরীফের এক হাদিসে আছে যে,দাজ্জাল মদিনার নিকটবর্তি এক জায়গায় পৌছালে মদিনা থেকে এক ব্যক্তি তার মোকাবেলার জন্যে বের হবেন।তিনি তৎকালিন লোকদের মধ্যে শ্রেষ্ঠতম হবেন কিংবা শ্রেষ্ঠতম লোকদের অন্যতম হবেন।আবু ইসহাক বলেনঃএ ব্যক্তি হাবেন হযরত খিযির (আঃ)। ইবনে আবিদদুনিয়া ‘কিতাবুল-হাওয়াতিফে’বর্ণনা করেন যে,হযরত আলী (রাঃ) হযরত খিযির (আঃ) এর সাথে সাক্ষাত করলে তিনি তাকে একটি দোয়া বলে দেন।যে ব্যক্তি এই দোয়া প্রত্যেক নামাযের পর পাঠ করবে।সে বিরাট সওয়াব, মাগফেরাত ও রহমত পাবে। যে ঐ সওা,যার এক কথা শোনা অন্য কথা শোনার প্রতিবন্ধক হয় না: হে ঐ সওা যাকে একই সময়ে করা লাখো-কোটি প্রশ্ন বিভ্রান্ত করে না এবং হে ঐ সওা যিনি ,দোয়ায় পীড়াপীড়ি করলে এবং বারবার বললে বিরক্ত হন না:আমাকে তোমার ক্ষমার স্বাদ আস্বাদন করাও এবং তোমার মাগফেরাতের স্বাদ দান কর। ’ অতঃপর এ গ্রন্থেই হুবহু এই ঘটনা,এই দোয়া এবং হযরত খিযির (আঃ)- এর সাথে সাক্ষাতের ঘটনা হযরত ইবনে ওমর বলেনঃ রসুলুল্লাহ (সাঃ) জীবনের শেষ দিকে এক রা েএ আমাদেরকে নিয়ে এশার নামায পড়েন। তোমরা কি আজকের রাতটি লক্ষ্য করছ? এই রাত থেকে একশ বছর অতীত হলে এ শতাব্দি শেষ হয়ে যাবে । কেউ কেউ খিযির (আঃ) এর জীবিত থাকার বিষয় সম্পর্কে সন্দেহ প্রকাশ করে বলেন যে,তিনি রসুলুল্লাহ (সাঃ) এর আমলে জীবিত থাকলে তার কাছে উপস্থিত হয়ে ইসলামের সেবায় আত্মনিয়োগ করা তার জন্যে অপরিহার্য ছিল। মুসা (আঃ)- জীবিত থাকলে আমার অনুসরণ করা ছাড়া তারও গত্যন্তর ছিল না। (কারণ আমার আগমনের ফলে তার ধর্ম রহিত হয়ে গেছে)কিন্তু এটা অসম্ভব নয় যে,খিযির (আঃ) এর জীবন ও নবুওয়াত সাধারণ পয়গম্বরদের থেকে ভিন্নরুপ হবে।তাকে আল্লাহর পক্ষ থেকে সৃষ্টিগত দায়িত্ব অর্পণ করা হয়েছে।তাই তিনি সাধারণ মানুষ থেকে আলাদাভাবে নিজের কাজে নিয়োজিত আছেন।শরীয়তে মুহাম্মদীর অনুসরণের ব্যাপারে এটা সম্ভব যে ,তিনি রসুলুল্লাহ (সাঃ) এর নবুওয়তের পর এ শরীয়তের অনুসরণ করে চলেছেন। আবু হাইয়্যান বাহরে মুহিত গ্রন্থে খিযির (আঃ) এর সাথে কয়েকজন বুযুর্গের সাক্ষাতের ঘটনা বর্ণনা করেছেন।কিন্ত সাথে সাথে একথাও বলেছেন ,সাধারণ আলেমদের মতে তার ওফাত হয়ে গেছে। তফসীর মাযহারীতে কাযী সানাউল্লাহ বলেনঃ হযরত সাইয়্যেদ আহমদ সেরহিন্দি মুজাদ্দিদে আলফেসানী তার কাশফের মাধ্যমে যেকথা বলেছেন,তার মধ্যেই সব বিতর্কের সমাধান নিহিত আছে। তিনি বলেনঃ আমি নিজে কাশফ জগতে হযরত খিযির (আঃ)- কে এ ব্যাপারে জিঙ্গেস করেছি।তিনি বলেছেনঃ আমি ও ইলিয়াস (আঃ) উভয়েই জীবিত নই।কিন্তু আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে এরুপ ক্ষমতা দান করেছেন যে ,আমরা জীবিত মানুষের বেশ ধারণ করে বিভিন্নভাবে মানুষকে সাহায্য করতে পারি । আমি পূর্বেই বলেছি যে,হযরত খিজির (আঃ)- এর মৃত্যু ও জীবদ্দশার সাথে আমাদের কোন বিশ্বাসগত অথবা কর্মগত বিষয় জড়িত নই।কিন্ত আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে এরুপ ক্ষমতা দান করেছেন যে, আমরা জীবিত মানুষের বেশ ধারণ করে বিভিন্নভাবে মানুষকে সাহায্য করতে পারি । আমি পূর্বেই বলেছি যে,হযরত খিযির (আঃ) এর মৃত্যুও জীবদ্দশার সাথে আমাদের কোন বিশ্বাসগত অথবা কর্মগত বিষয় জড়িত নয়। কিন্তু প্রশ্নটি জনগনের মধ্যে বহুল প্রচলিত,তাই উল্লেখিত বিবরণ উদ্ধৃত করা হয়েছে। কারনেই কোরআন ও হাদীসে এ সম্পর্কে রেওয়ায়েত থেকে জানা যায় যে, তারা ছিল মক্কার কোরাইশ সম্প্রদায়।মদীনার ইহুদীরা তাদেরকে রসুলুল্লাহ (সাঃ) এর নবুওয়ত ও সততা যাচাই করার জন্যে তিনটি প্রশ্ন বলে দিয়েছিলঃ রুহ আসহাবে কাহফ ও যুলকারনাইন ।