ইয়াজুজ মাজুজ

ইয়াজুজ-মাজুজ সম্পর্কে ইসরাঈলী রেওয়ায়েতে ও ঐতিহাসিক কিসসা-কাহিনিতে অনেক ভিওিহীন অলীক কথাবার্তা প্রচলিত রয়েছে।কোন কোন তফসীরবিদও এগুলো ঐতিহাসিক দৃষ্টিকোণ থেকে উদ্ধত করেছেন,কিন্তু স্বয়ং তাদের কাছেও এগুলো নির্ভরযোগ্য নয়।কোরআন পাক তাদের সংক্ষিপ্ত অবস্থা বর্ণনা করেছে এবং রাসুলুল্লাহ (সাঃ) ও প্রয়োজনীয় তথ্যদি সম্পর্কে উম্মতকে অবহিত করেছেন। ঈমান ও বিশ্বাস স্থাপনের বিষয় ততটুকুই যতটুকু কোরআন ও হাদীসে বর্ণিত  হয়েছে।তফসীর,হাদীস ও ইতিহাসবিদগণ এর অতিরিক্ত যেসব ঐতিহাসিক ও ভৌগলিক অবস্থা বর্ণনা করেছেন,সেগুলো বিশুদ্ধও হতে পারে এবং অশুদ্ধও হতে পারে ।ইতিহাসবিদগণের বিভিন্নমুখি উক্তিগুলো নিছক ইঙ্গিত ও অনুমানের উপর ভিওিশীল।এগুলো শুদ্ধ কিংবা অশুদ্ধ হলেও তার কোন প্রভাব কোরআনের বক্তব্যের উপর পড়ে না।              আমি এখানে সর্বপ্রথম এ সম্পর্কিত সহিহ ও নির্ভরযোগ্য হাদীসগুলো উল্লেখ করছি। এরপর প্রয়োজন অনুসারে ঐতিহাসিক রেওয়াতেও বর্ণনা করা হবে।                        ইয়াজুজ-মাজুজ সম্পর্কে হাদীসের বর্ণনাঃ কোরআন ও হাদীসের সুষ্পষ্ট বর্ণনা থেকে এতটুকু নিঃসন্দেহে প্রমাণিত হয় যে, ইয়াজুজ-মাজুজ মানব সম্প্রদায়ভুক্ত।অন্যান্য মানবের মত তারাও নূহ (আঃ)-এর সন্তান-সন্ততি।কোরআন পাক ষ্পষ্টতই বলেছে অর্থাৎ নুহের মহাপ্লাবনের পর দুনিয়াতে যত মানুষ আছে এবং থাকবে,তারা সবাই নুহ (আঃ)-এর সন্তান-সন্ততি হবে।ঐতিহাসিক রেওয়ায়েত এ ব্যপারে একমত যে,তারা ইয়াফেসের বংশধর।একটি দুর্বল হাদীস থেকেও এর সমর্থন পাওয়া যায়।তাদের অবশিষ্ট অবস্থা সম্পর্কে সর্বাধিক বিস্তারিত ও সহীহ হাদীস হচ্ছে হযরত নাওয়াস ইবনে সামআন (রাঃ) এর হাদীসটি।এটি সহিহ মুসলিম ও অন্যান্য সব নির্ভরযোগ্য হাদীস গ্রন্থে উল্লেখিত হয়েছে।হাদীসবিদগণ একে সহিহ আখ্যা দিয়েছেন। এতে দাজ্জালের আর্বিভাব,ঈসা (আঃ)- এর অবতরণ,ইয়াজুজ-মাজুজের অভ্যুত্থান ইত্যাদির পূর্ণ বিবরণ উল্লেখিত আছে।হাদিসটির অনুবাদ নিম্নরুপঃ হযরত নাওয়াস ইবনে-সামআন (রাঃ) বলেনঃরাসুলুল্লাহ (সাঃ)একদিন ভোর বেলা দাজ্জালের আলোচনা করলেন।আলোচনা প্রসঙ্গে তিনি তার সম্পর্কে এমন কিছু কথা বললেন,যদ্দারা মনে হচ্ছিল যে,সে নেহাতই তুচ্ছ ও নগণ্য (উদাহরণতঃজান্নাত ও দোযখ তার সাথে থাকবে এবং অন্যান্য আরও অস্বাভাবিক ও ব্যতিক্রমধর্মি ঘটনা ঘটবে।)রসুলুল্লাহ (সাঃ) এর বর্ণনার ফলে (আমরা এমন ভীত হয়ে পড়লাম) যেন দাজ্জাল খর্জুর বৃক্ষের ঝড়ের মধ্যেই রয়েছে।বিকালে যখন আমরা রসুলুল্লাহ (সাঃ) এর দরবারে উপস্থিত হলাম,তখন তিনি আমাদের মনের অবস্থা আঁচ করে নিলেন এবং জিঙ্গেস করলেনঃতোমরা কি বুঝেছ?আমরা আরয করলামঃ আপনি দাজ্জালের আলোচনা প্রসঙ্গে এমন কিছু কথা বলেছেন,যাতে বোঝা যায় যে,তার ব্যপারটি নেহাতই তুচ্ছ এবং আরও কিছু কথা বলেছেন,যাতে মনে হয় সে খুব শক্তিশালি সম্পন্ন হবে এবং তার ফেৎনা হবে খুব গুরুতর।এখন আমাদের মনে হয়েছে যে ,যেন সে আমাদের নিকটেই খর্জুরবৃক্ষের  ঝাড়ের মধ্যে লুকিয়ে আছে।            রাসুলুল্লাহ (সাঃ) বললেনঃতোমাদের সম্পর্কে আমি যেসব ফেৎনার আশঙ্কা করি ,দাজ্জালের তুলনায় অন্যান্য ফেৎনা অধিক ভয়েরযোগ্য। যদি আমার জীবদ্দশায়  সে আবির্ভুত হয় তবে আমি নিজে তার মোকােবেলা করব।(কাজেই তোমাদের চিন্তান্বিত হওয়ার কোন কারন নেই।) পক্ষান্তরে সে যদি আমার পরে আসে ,তবে প্রত্যেকেই নিজ নিজ সামর্থ্য অনুযায়ী তাকে পরাভূত করার চেষ্টা করবে। আমার অনুপস্থিতে আল্লাহ তাআলা প্রত্যেক মুসলমানের সাহায্যকারী।(তার লক্ষণ এই যে) সে যুবক ,ঘন কোঁকড়ানো চুলওয়ালা হবে।তার একটি চক্ষু উপরের দিকে উত্থিত হবে।যদি আমি কোন ব্যক্তিকে তার সাথে তুলনা করি,তবে সে হচ্ছে আবদুল ওযযা ইবনে কুতনা।যদি কোন মুসলমান দাজ্জালের সম্মুখীন হয়ে যায়,তবে সূরা কাহফের প্রথম আয়াতগুলো পড়ে নেয়া উচিত।দাজ্জাল সিরিয়া ও ইরাকের মধ্যবর্তি স্থান থেকে বের হয়ে চর্তুদিকে হাঙ্গামা সৃষ্টি করবে ।হে আল্লাহর বান্দারা,তোমরা তার মোকাবেলায় সুদৃঢ় থাক। আমরা  আরয করলামঃইয়া রসুলুল্লাহ (সাঃ)যে দিনটি এক বছরের সমান হবে,আমরা কি শুধু এক দিনের (পাঁচ ওয়াক্ত) নামাযই পড়ব?তিনি বললেনঃনা;বরং সময়ের অনুমান করে পূর্ণ এক বছরের নামায পড়তে হবে।আমরা আবার আরয করলামঃইয়া রাসুলুল্লাহ,সে কেবল দ্রুতগতিতে সফর করবে?তিনি বললেন:না বরং সময়ের অনুমান করে পুর্ন এক বছরের নামায পড়তে হবে। আমরা আবার আরয করলামঃইয়া রসুলুল্লাহ সে কেমন দ্রুতগতিতে সফর করবে?তিনি বললেনঃসে মেঘখন্ডের মত দ্রুত চলবে,যার পেছনে  অনুকূল বাতাস থাকে ।দাজ্জাল কোন সম্প্রদায়ের কাছে তাকে মিথ্যা ধর্মবিশ্বাসের প্রতি দাওয়াত দেবে।তারা তাতে বিশ্বাস স্থাপন করলে সে মেঘমালাকে বর্ষনের আদেশ দেবে।ফলে বৃষ্টি বর্ষিত হবে এবং মাটিকে আদেশ দেবে;ফলে সে  শস্য-শ্যামলা হয়ে যাবে।(তাতে চতুষ্পদ জন্তু তাতে চরবে)সন্ধ্যায় যখন জন্তুগুলো ফিরে আসবে,তখন তাদের কুঁজ পূর্বের তুলনায় উঁচু হবে এবং স্তন দুধে পরিপূর্ণ থাকবে।এরপর দাজ্জাল অন্য সম্প্রদায়ের কাছে যাবে  এবং তাদেরকেও কুফরের দাওয়াত দেবে।কিন্তু তারা তার দাওয়াত প্রত্যাখান করবে । সে নিরাশ হয়ে ফিরে গেলে সেখানকার মুসলমানরা দুর্ভিক্ষে পতিত হবে । তাদের কাছে কোন অর্থ কড়ি থাকবে না।সে শস্যবিহিন অনুর্বর ভূমিকে সম্বোধন করে বলবে ঃ তোর গুপ্তধন বাইরে নিয়ে আয়।সেমতে ভূমির গুপ্তধন বাইরে  নিয়ে আয়। সেমতে ভূমির গুপ্তধন তার পেছনে পেছনে চলবে; যেমন মৌমাছিরা তাদের সরদারের পেছনে পেছনে চলে। অতঃপর দাজ্জাল  একজন ভরপুর যুবক ব্যক্তিকে ডাকবে এবং তাকে তরবারির আঘাতে ‍দ্বিখন্ডিত করে দেবে। তার উভয় খন্ড এতটুকু দুরত্বে রাখা হবে: যেমন তীর নিক্ষেপকারী ও তার লক্ষ্যবস্তুর মাঝখানে থাকে ।অতঃপর সে তাকে ডাক দেবে। সে (জীবিত হয়ে)দাজ্জালের কাছে প্রফুল্ল চিওে চলে আসবে।ইতিমধ্যে আল্লাহ তাআলাই হযরত  ঈসা (আঃ)-কে নামিয়ে দেবেন।তিনি দুটি রঙিন চাদর  পরে দামেস্কে মসজিদের পূর্ব দিককার সাদা মিনারে ফেরেশতাদের পাখার  উপর  পা রেখে  অবতরণ করবেন।তখন তা থেকে পানির ফোটা পড়বে।(মনে হবে যেন এখনই গোসল করে এসেছেন।) তিনি যখন মস্তক উচু করবেন,তখন তা থেকে পানির ফোঁটা পড়বে।তার শ্বাস প্রশ্বাস তার দৃষ্টির সমান দুরত্বে পৌছাবে।হযরত ঈসা (আঃ) তাকে খুজতে খুজতে বাবুল্লুদে গিয়ে তাকে  ধরে ফেলবেন ।সেখানে তাকে হত্যা করবেন । এরপর তিনি জনসমক্ষে আসবেন,স্নেহভরে মানুষের চেহারার হাত বুলাবেন এবং তাদেরকে জান্নাতের  সুউচ্চ মর্যাদার সুসংবাদ শোনাবেন।

Leave a Comment